• মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:১৪ পূর্বাহ্ন

বন্ধ হয়েছে ৯৫ কারখানা, কাজ হারিয়েছেন ৬২ হাজার শ্রমিক

admin
আপডেটঃ : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

জাতীয় ডেস্ক রিপোর্টঃ বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্রে বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে। অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে প্রবাসী আয় ও রিজার্ভসহ ১২টি খাতে অগ্রগতি অর্জিত হলেও, মূল্যস্ফীতি ও মাথাপিছু ঋণসহ বাকি ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতি হয়েছে। জানুয়ারির পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান তিনটি শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি শিল্প-কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন।

গতকাল সোমবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস :একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ও অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান এ সময় উপস্থিত ছিলেন। ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে এ অনুষ্ঠান হয়।

বিগত ছয় মাসের মূল্যায়ন তুলে ধরে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রধান দুটি প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বিগত ছয় মাসের সার্বিক পর্যালোচনায় এই দুটির একটিতেও আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যায়নি, বরং দুই প্রত্যাশাতেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের অস্বস্তি। বিগত সরকারের কাছ থেকে বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। টাকা সংকট, ব্যাংকিং খাতের করুণ দশা, অনাদায়ী ঋণ, অর্থ পাচার ও রাজস্ব ঘাটতির মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে ছিল। তবে এগুলো সামলে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে আশানুরূপ গতি দেখা যায়নি। দুর্নীতি বন্ধ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট এবং ‘মব কালচার’ বন্ধ করাই ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি থাকলেও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে পদায়ন করা হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের পক্ষ থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার পরও দেশে মব ভায়োলেন্স অব্যাহত রয়েছে। নারী, শিশু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে, যার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কার্যকর প্রতিরোধ দেখা যায়নি। গুম ও মানবাধিকার রক্ষায় তৈরি আইনে নানা ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে। বিশেষ করে, আইন ভঙ্গকারীকে দিয়ে অনুসন্ধান করানোর কারণে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

অবশ্য সরকারের কিছু সাফল্য রয়েছে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এ সরকার যখন আসে, তখন উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু কাঠামোগত অসুবিধা পেয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতিও তখন ইতিবাচক ছিল না। শুরু হয় যুদ্ধ। সমস্যা হচ্ছে, দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে এ সরকার একটি সমন্বিত দলিল তৈরি করল না। এ কারণে এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার বারবার বলছে যে তারা খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু কী পরিস্থিতি থেকে দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে, তার একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করা হয়নি। ফলে এখন সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে পরিসংখ্যানের সমন্বয় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিনিয়োগে গতি নেই, বন্ধ হয়েছে ৯৫ কারখানা

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াকে অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সিপিডির পর্যালোচনার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪.৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক হয়েছে এবং নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। উত্পাদন খাতের পরিস্থিতিকে ‘শঙ্কাজনক’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি থেকে নেতিবাচক অবস্থায় চলে গেছে। এসব সূচকে দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। দেবপ্রিয় বলেন, রিজার্ভ বাড়া বা পুঁজিপণ্য আমদানির মতো কিছু সূচক ইতিবাচক দেখালেও সেগুলোর পেছনের কারণও বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়াটা স্বাস্থ্যের লক্ষণ নাকি এটা রক্তশূন্যতার লক্ষণ? এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বিনিয়োগ না হওয়ার কারণে আমদানি কম হচ্ছে এর প্রভাবে রিজার্ভ বাড়ছে।

সিপিডির পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিনটি শিল্পঘন এলাকা গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী এলাকায় ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে ৬১ হাজার ৮৮১ জনের কর্মসংস্থান হারিয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। সেই বিবেচনায় রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিও ‘উদ্বেগজনক’ বলে মনে করছে সিপিডি।

‘আড়াই-তলা সরকার’: সরকারের কাঠামো নিয়েও মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন পদমর্যাদার বিশেষ সহকারীদের নিয়ে গঠিত সরকারকে তিনি ‘আড়াই-তলা সরকার’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশি জনপ্রিয়। সরকারের যে অ্যাপ্রুভাল রেটিং, সেটাও খারাপ না, ৫০-এর ওপরে। কিন্তু জনপ্রিয় হলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তার যে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আছে, সেটা দিয়ে উনি রাজনৈতিক সাহস দেখিয়ে নিজের দলের লোকজনদের ঠিক পথে পরিচালনা করতে পারবেন কি না, আমলাকে ঠিক জায়গাতে রাখতে পারবেন কি না—এটিই আমি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি। ছয় মাসের সরকারের সামগ্রিক মূল্যায়নে তিনি বলেন, ‘দিতে চাই ‘এ’, কিন্তু টানে তো ‘বি’-এর দিকে।’

পে-স্কেলের সিদ্ধান্ত দেরি হলে পরিস্থিতি জটিল হবে

এক প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো করতে সরকার রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পারছে না। বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যা কমবে না, বরং যত দেরি হবে, পরিস্থিতি তত জটিল হবে বলে মনে করেন তিনি। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ছয় মাসেও বেতন-ভাতার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। কেন পারছেন না? একটা বড় বিষয় আছে, আর্থিক সক্ষমতা। অন্তর্বর্তী সরকার বেতন-কাঠামোর যে প্রতিবেদন দিয়ে গেছে, তা মূল্যায়ন করে ভাগে ভাগে বেতন-কাঠামো বাস্তবায়নের একটা সুপারিশ এসেছিল এবং তা সবাই মেনেও নিয়েছিল। এত দেরি না করে শুরুতেই যদি ২০-২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে দিতেন আর সময় প্রার্থনা করতেন, সেটা খুব ভালো হতো। এখন যে জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে, তা ভালো হয়নি। বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যা কমবে না, বরং যত দেরি হবে, পরিস্থিতি তত জটিল হবে বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

Loading


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ