• বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৬ অপরাহ্ন

এভিয়েশন খাতে ‘পারফেক্ট স্টর্ম’: স্থবির বিশ্ব আকাশপথ

admin
আপডেটঃ : বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬

বিশ্ব ডেস্ক রিপোর্টঃ বিশ্বজুড়ে আকাশপথের যাত্রী ও বিমান সংস্থাগুলোর ওপর নেমে এসেছে এক অভূতপূর্ব দুর্যোগ। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও বিমান চলাচলের জ্বালানি বা ‘জেট ফুয়েলে’র দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক এভিয়েশন শিল্প এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে এয়ারলাইন্সগুলো।

একই সঙ্গে আকাশচুম্বী বিমান ভাড়া এবং আনুষঙ্গিক ফি বৃদ্ধির ফলে সাধারণ যাত্রীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে আকাশপথের ভ্রমণ। বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে এভিয়েশন খাতের জন্য একটি ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ বা চরম সংকটকাল হিসেবে অভিহিত করছেন।

জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম ও সরবরাহ সংকট

দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে জেট ফুয়েলের দাম ৭৪২ ডলার থেকে বেড়ে ১,৭১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-চ্যানেল ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে তেলের জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছায়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও এভিয়েশন অ্যানালিস্ট অ্যালেক্স ম্যাকিরাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) সতর্ক করে বলেছেন, প্রধান ইউরোপীয় বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে জেট ফুয়েলের মারাত্মক সংকট তৈরি হতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, অনেক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বিমান সংস্থাগুলোকে ‘জ্বালানি নেই’ (No Fuel Available) এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছে। এই সংকট কেবল ইউরোপে সীমাবদ্ধ নেই; এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোও এখন বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক দীর্ঘ পাল্লার ফ্লাইটকে গন্তব্যে পৌঁছানোর পথে অন্য কোনো দেশে যাত্রাবিরতি বা ‘ফুয়েল স্টপ’ নিতে হচ্ছে, যা সময় ও খরচ— উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ফ্লাইট বাতিলের হিড়িক ও পরিসংখ্যান

এভিয়েশন অ্যানালিটিক্স কোম্পানি ‘সিরিয়াম’-এর তথ্যমতে, গত সোমবার নির্ধারিত ফ্লাইটের মধ্যে প্রতি ২০টির একটি বাতিল করা হয়েছে। গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বাতিলের এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। গত সোমবার বিশ্বজুড়ে নির্ধারিত ১ লাখ ৪ হাজার ৬১৮টি ফ্লাইটের মধ্যে ৭ শতাংশ বা ৭,০৪৯টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। গত বছর একই দিনে বাতিলের হার ছিল ৪.৭ শতাংশ।

সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখা দিয়েছে উত্তর আমেরিকায়। সেখানে গত সোমবার ১৪.৬ শতাংশ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যা গত বছর ছিল মাত্র ৪.৪ শতাংশ। ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রথম বড় মার্কিন সংস্থা হিসেবে তাদের মোট সক্ষমতার ৫ শতাংশ ফ্লাইট কমিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও একই চিত্র

এয়ার নিউজিল্যান্ড মে মাসের শুরু পর্যন্ত ১,১০০টি ফ্লাইট বাতিল করেছে। এসএএস (স্ক্যান্ডিনেভিয়ান গ্রুপ) এপ্রিলে অন্তত ১,০০০টি ফ্লাইট বাতিলের পরিকল্পনা করেছে। অন্যদিকে, ভিয়েতনাম এয়ারলাইন্স জ্বালানির দাম প্রতি ব্যারেল ১৬০-২০০ ডলারে পৌঁছালে মাসে ১০ থেকে ২০ শতাংশ ফ্লাইট কমানোর কথা জানিয়েছে।

dhakapost
নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। মে মাসের শুরু পর্যন্ত প্রায় ১,১০০টি ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে এয়ার নিউজিল্যান্ড / ছবি- সংগৃহীত
বিমান ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ বৃদ্ধি

জ্বালানির বাড়তি খরচ সমন্বয় করতে গিয়ে এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের পকেট কাটতে শুরু করেছে। ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স-এর প্রধান নির্বাহী স্কট কার্বি ব্লুমবার্গকে জানিয়েছেন, লোকসান এড়াতে বিমান ভাড়া অন্তত ২০ শতাংশ বাড়াতে হবে। অনেক রুটে গড় বিমান ভাড়া ইতোমধ্যে ৪৬৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০১৯ সালের পর সর্বোচ্চ।

জ্বালানি কর বা ‘ফুয়েল সারচার্জ’ এর পাশাপাশি অন্যান্য আনুষঙ্গিক ফি-ও বাড়ানো হচ্ছে। জেটব্লু (JetBlue) তাদের ব্যাগেজ ফি বা মালামাল বহনের খরচ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। একে তারা ‘পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। থ্রিনফটি ট্রাভেলার (Thrifty Traveler)-এর নির্বাহী সম্পাদক কাইল পটার বলেন, এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণত একসাথে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তাই অদূর ভবিষ্যতে অন্যান্য সংস্থাও ব্যাগেজ ফি বা অন্যান্য অতিরিক্ত সেবার চার্জ বাড়িয়ে দেবে। মজার বিষয় হলো, টিকিটের দামের ওপর সরকারি শুল্ক থাকলেও এসব ফি’র ওপর শুল্ক দিতে হয় না, ফলে এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য এটি লাভের পথ প্রশস্ত করে।

‘ইমারজেন্সি ম্যানেজমেন্ট’ ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই

ইউরোনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অলিম্পিক এয়ারওয়েজের সাবেক প্রধান রিগাস ডোগানিস মনে করেন, এয়ারলাইন্সগুলো এখন অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে চাহিদা ধরে রাখতে ভাড়া কমানোর চাপ, অন্যদিকে উচ্চ জ্বালানি খরচের কারণে ভাড়া বাড়ানোর বাধ্যবাধকতা— সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে দক্ষিণ কোরিয়ার পতাকাবাহী সংস্থা ‘কোরিয়ান এয়ার’ ১ এপ্রিল থেকে ‘জরুরি ব্যবস্থাপনা’ বা ‘এমারজেন্সি ম্যানেজমেন্ট’ কার্যক্রম শুরু করেছে। সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান উ কি-হং এক অভ্যন্তরীণ নোটিশে জানান, এটি কেবল সাময়িক খরচ কমানোর চেষ্টা নয়, বরং কোম্পানির মূল ভিত্তি মজবুত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার অংশ।

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা

ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক পরিণাম এখন বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৪ ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধের শুরু থেকে প্রধান শেয়ার বাজারগুলোর সূচকও প্রায় ১০ শতাংশ পড়ে গেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর তথ্যমতে, যুক্তরাজ্য তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে রয়েছে। হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় ব্রিটেনের দিকে আসা কোনো তেলের জাহাজ বর্তমানে সাগরে দেখা যাচ্ছে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই সংকট পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। নিজ ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে তিনি যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশ যারা হরমুজ প্রণালীর কারণে জ্বালানি পাচ্ছে না, তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘এক, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তেল কিনুন, আমাদের প্রচুর আছে। দুই, একটু সাহস সঞ্চয় করে প্রণালীতে গিয়ে তা দখল (TAKE IT) করুন।’ তার এই বক্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রমোদতরীতেও বাড়তি চাপের আঁচ

জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব কেবল আকাশে সীমাবদ্ধ নেই, তা সমুদ্রেও ছড়িয়েছে। স্টারড্রিম ক্রুজ জানিয়েছে, ২০ মার্চ থেকে যারা নতুন বুকিং দিচ্ছেন, তাদের প্রতি রাতের জন্য জনপ্রতি ১৫ ডলার বাড়তি সারচার্জ দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে, জ্বালানির দাম কমলে এই বাড়তি খরচ কমিয়ে আনা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

বিত্তবানদের ওপর নির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে টিকিট বিক্রির হার রেকর্ড উচ্চতায় ছিল। এর কারণ হিসেবে কাইল পটার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিত্তবান ভ্রমণপিপাসুদের সংখ্যা এবং সামর্থ্য আগের চেয়ে অনেক বেশি। এয়ারলাইন্সগুলো এখন তাদের ওপরই ভরসা করছে, কারণ উচ্চ ফি বা বাড়তি ভাড়া তাদের ভ্রমণে খুব একটা বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তবে, সাধারণ ও মধ্যবিত্ত যাত্রীদের জন্য আকাশপথের ভ্রমণ এখন বিলাসবহুল স্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৭৫ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। যদি এমনটি হয়, তবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত তেলের দাম ১০০ ডলারের উপরেই থাকতে পারে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম এবং লুফথানসা ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে তাদের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও পঙ্গু করে দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক এভিয়েশন খাত এখন এক গভীর খাদের কিনারায়। একদিকে জ্বালানির তীব্র সংকট ও আকাশচুম্বী দাম, অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। যতক্ষণ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থামছে না এবং তেলের সরবরাহ পথগুলো পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে না, ততক্ষণ বিমান যাত্রীদের এই চড়া মূল্য দিয়ে এবং ফ্লাইটের অনিশ্চয়তা নিয়েই পথ চলতে হবে।

Loading


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ