বিশ্ব ডেস্ক রিপোর্টঃ ইসরায়েলের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এই আশঙ্কায় অস্কার মনোনীত চলচ্চিত্র ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজব’-এর মুক্তি আটকে দিয়েছে ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন (সিবিএফসি)। মার্কিন সাময়িকী ‘ভ্যারাইটি’-র এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
তিউনিসীয় পরিচালক কাউথার বেন হানিয়া পরিচালিত এই ডকুড্রামায় ফুটে উঠেছে পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজবের করুণ কাহিনী। গাজায় উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় একটি গাড়ির ভেতর ইসরায়েলি সেনাদের ৩৩৫ রাউন্ড গুলিতে নিহত হয়েছিল সে। গত সেপ্টেম্বর মাসে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর ছবিটি ২৩ মিনিটব্যাপী দাঁড়িয়ে সম্মান পায়।
ছবিটির ভারতীয় পরিবেশক মনোজ নন্দওয়ানা ‘মিডল ইস্ট আই’কে (এমইই) জানান, মার্চ মাসে ছবিটির মুক্তির লক্ষ্যে তিনি ফেব্রুয়ারিতে সিবিএফসি-র কাছে অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে ভ্যারাইটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিবিএফসি ছবিটি আটকে দেয় এবং নন্দওয়ানাকে জানায় যে, “এই ছবিটি মুক্তি পেলে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কে ফাটল ধরতে পারে।”
নন্দওয়ানা এমইই-কে বলেন, এটি ছিল একটি “ভুল সময়”। কারণ ২৭ ফেব্রুয়ারি ছবিটি সিবিএফসি-র কাছে প্রদর্শিত হয়েছিল, যার ঠিক একদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েল সফর শেষ করেছিলেন। পরিবেশক আরও জানান, এই সিদ্ধান্তে তিনি অবাক হননি কারণ এর আগে গোয়া, ব্যাঙ্গালোর, পুনে এবং কেরালাসহ ভারতের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবেও ছবিটি প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ছবিটির সহ-প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ফিলিস্তিনি-আমেরিকান কোম্পানি ‘ওয়াটারমেলন পিকচার্স’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা বাদি আলি বলেন, “যখন আমরা শুনলাম যে এই ছবি ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য হুমকি, তখন আমাদের প্রথম চিন্তা ছিল: কখন থেকে একটি পাঁচ বছরের শিশুর আর্তনাদ কূটনৈতিক হুমকি হয়ে উঠল?” তিনি আরও যোগ করেন, “ভারতীয় দর্শকদের একটি সত্য গল্প দেখা থেকে বিরত রাখার প্রয়োজন নেই। এটি সেন্সর করার মাধ্যমে বিশ্বের কাছে এই বার্তাই যায় যে, হিন্দের গল্পটি এখনও ক্ষমতাবানদের আতঙ্কিত করে।”
পরিচালক বেন হানিয়া এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, “‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র’ এবং ‘মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতন্ত্রের’ মধ্যকার সম্পর্ক কি এতটাই নড়বড়ে যে একটি চলচ্চিত্র তা ভেঙে দিতে পারে?”
উল্লেখ্য, গত মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েল সফর করেন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও দৃঢ় করার অঙ্গীকার করেন। ভারত বর্তমানে ইসরায়েলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক। এছাড়া গাজায় চলমান যুদ্ধের মধ্যেও ভারত ইসরায়েলকে অস্ত্র ও শ্রমিক সরবরাহ করে আসছে এবং উভয় দেশ প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য সংক্রান্ত নতুন নতুন চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে।
ভারতীয় অধিকারকর্মী সৃষ্টি খান্না এবং প্রশান্ত পুন্ডির জানান, ছবিটি নিষিদ্ধ হওয়ার আগে তারা একটি স্বতন্ত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন যা ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। তাদের মতে, এই সেন্সরশিপ গাজায় চলমান গণহত্যা এবং ফিলিস্তিনের বাস্তবতাকে ধামাচাপা দেওয়ার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
বর্তমানে নন্দওয়ানার দল এই সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করেছে। তারা আশা করছেন কোনো “অলৌকিক কিছু” ঘটবে যাতে ভারতের সাধারণ মানুষ ছবিটি দেখার সুযোগ পায়। তবে এই বিষয়ে সিবিএফসি-র পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
![]()