• রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৫:১২ পূর্বাহ্ন

দীর্ঘ যুদ্ধের পথে মধ্যপ্রাচ্য

admin
আপডেটঃ : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬

বিশ্ব ডেস্ক রিপোর্টঃ

  • ইরানে নিহত বেড়ে ১৩৩২ ক্ষতিগ্রস্ত ৩৬৪৩ স্থাপনা
  • ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি ট্রাম্পের
  • আরও হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের
  • মধ্যপ্রাচ্যে দুইশ শিশু নিহত: ইউনিসেফ

ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গণহত্যাকারী ইসরায়েল ও তাদের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রের অসম যুদ্ধের সপ্তম দিনে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ইরানজুড়ে বিমান হামলা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এরই মধ্যে ইরানে নিহত বেড়ে ১ হাজার ৩৩২ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ৩,৬৪৩টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। এদিকে, ইরানে চলমান সামরিক অভিযানের সময়সীমা নিয়ে নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের শুরুতে খুব দ্রুত অভিযান শেষ করার কথা বললেও এখন তিনি জানিয়েছেন, লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চলবে এবং এতে যত সময় লাগুক তিনি পিছপা হবেন না। আর ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর মুখপাত্র (আইআরজিসি) আলি মোহাম্মদ নাঈনি বলেছেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। এদিকে, ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করে ট্রাম্প বলছেন, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না।

গতকাল শুক্রবার আল জাজিরাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। আর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গতকাল সকালে তেহরানের সরকারি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার ‘নতুন পর্যায়’ বলে ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হারানোর পরও ইরানের এমন পাল্টা আক্রমণ যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে দেশটি। একই সঙ্গে গোয়েন্দা কার্যক্রমের পরিসর বাড়ানোর তৎপরতা শুরু করেছে পেন্টাগন। এ যুদ্ধ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে-এমনটি মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান কয়েক সপ্তাহ নয়, বরং কয়েক মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ইতোমধ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম পলিটিকো। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড পেন্টাগনের কাছে অতিরিক্ত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে ফ্লোরিডার টাম্পায় অবস্থিত সদর দপ্তরে মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়েছে। এই অতিরিক্ত কর্মকর্তারা অন্তত ১০০ দিন বা সম্ভাব্যভাবে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে সহায়তা করবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন শুরুতে যে সময়সীমা উল্লেখ করেছিল, তার চেয়ে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত এবং শিগগিরই নতুন প্রজন্মের কৌশলগত অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে জানিয়ে দেশটির অভিজাত সামরিক বাহিনী আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মাদ নায়েইনি জানান, আগ্রাসনের জবাব দিতে ইরান দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। ট্রæ প্রোমিজ ৪-এর অভিযানের অধীনে এখন পর্যন্ত যে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়েছে, তা ইরানের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতার কেবল একটি ছোট অংশ।

নায়েইনি আরও জানান, ইরানের নতুন উদ্যোগ ও নতুন অস্ত্র আসছে। এসব প্রযুক্তি এখনো বড় পরিসরে ব্যবহার করা হয়নি। শত্রুপক্ষকে আগামী প্রতিটি সামরিক অভিযানে কঠোর আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

এদিকে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। তার পরের দিন ১ মার্চ সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছিলেন, আগামী ৪ সপ্তাহের মধ্যে ইরানে সামরিক অভিযান শেষ হবে বলে আশা করছেন তিনি।

তিনি এই বক্তব্য দেওয়ার পরের দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগেসেথ বলেন, যুদ্ধ ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। গত বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সাময়িকী টাইম-কে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো নির্ধারিত সময়সীমা নেই। ইরানে আমি শুধু আমাদের লক্ষ্য পূরণ করতে চাই। ’

ইরানে নিহত বেড়ে ১,৩৩২, ক্ষতিগ্রস্ত ৩,৬৪৩ স্থাপনা: ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার সপ্তম দিনে গতকাল পর্যন্ত ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৩৩২ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ৩,৬৪৩টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান রেড ক্রিসেন্ট। রেড ক্রিসেন্ট বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বাহিনীর হামলার পর বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে এবং নিহতের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এছাড়াও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। হামলার ফলে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং চিকিৎসা কেন্দ্রসহ হাজারো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট।

সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট পীর হোসেন কলিভান্দ জানিয়েছেন, সা¤প্রতিক এই সামরিক অভিযানে মোট ৩,৬৪৩টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের আবাসিক ঘরবাড়ি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩,০৯০টি ব্যক্তিগত বাড়িঘর ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সংঘাতের মানবিক দিকটি আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

রেড ক্রিসেন্টের হিসাব অনুযায়ী, আবাসিক ভবনের পাশাপাশি ৫২৮টি বাণিজ্যিক ও সেবা কেন্দ্রও হামলার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ১৪টি চিকিৎসা ও ওষুধ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সংস্থাটির নিজস্ব ৯টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান, ইরান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করুক। তিনি বলেছেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না।’ নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ কথা বলেন। ইরানের আত্মসমর্পণের পর নতুন ‘গ্রহণযোগ্য’ ইরানি নেতাদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পুনর্গঠনে সাহায্য করবে।

ইরানের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম টর্পেডো: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে আবারও সমুদ্রের নিচ থেকে ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে একটি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার কাছে মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডো হামলায় ইরানের যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা ডুবে গেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

পেন্টাগনের এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘এই হামলাকে নীরব মৃত্যু হিসেবে দেখা হচ্ছে।’ অন্যদিকে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বিষয়টি পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবহৃত টর্পেডোটি তাৎক্ষণিক প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

ইরানে সেনা পাঠানো সময়ের অপচয়: ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই মুহূর্তে ইরানে মার্কিন সেনা পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘সময়ের অপচয়’ হবে। তিনি জানান, এখনই এমন কোনো পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছেন না।

গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা সময়ের অপচয়। তারা সব কিছু হারিয়েছে। তারা তাদের নৌবাহিনী হারিয়েছে। তারা যা হারাতে পারে তার প্রায় সবই হারিয়েছে।’

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সাম্প্রতিক মন্তব্যও উড়িয়ে দেন। আরাঘচি এনবিসিকে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সম্ভাব্য স্থল আক্রমণের জন্য ইরান প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্প ওই বক্তব্যকে ‘অযথা মন্তব্য’ বলে উল্লেখ করেন।

আরও হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের: ইরানের সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মদ নাইনি জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং এ লক্ষ্যে নতুন কিছু অস্ত্র আগে থেকেই সংরক্ষণ করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। এজন্য নতুন অস্ত্রও আমরা আলাদাভাবে তুলে রেখেছি। সেসব এখনও বড় মাত্রায় ব্যবহার করা হয়নি। নতুন অস্ত্রগুলো শত্রæদের গুরুতর এবং যন্ত্রণাদায়ক প্রত্যাঘাত করবে। বর্তমানে সেগুলো পাইপলাইনে আছে, যথাসময়ে ব্যবহার করা হবে।

প্রথম ১০০ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৩৭০ কোটি ডলার: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই ওয়াশিংটনের আনুমানিক খরচ হয়েছে ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার। এ হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৯০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। মূলত বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহারের কারণেই এই বিশাল ব্যয় হচ্ছে। নতুন এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর (সিএসআইএস) এক বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের এই আকাশচুম্বী ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। গতকাল শুক্রবার এই যুদ্ধ সপ্তম দিনে পড়েছে। আজও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর স্টিলথ বোমারু বিমান এবং উন্নত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

গবেষক মার্ক কানসিয়ান এবং ক্রিস পার্ক জানিয়েছেন, প্রথম ১০০ ঘণ্টার প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার (প্রতিদিন গড়ে ৮৯ কোটি ১৪ লাখ ডলার) ব্যয়ের মধ্যে খুব সামান্য অংশই বাজেটে বরাদ্দ ছিল। বাকি ৩৫০ কোটি ডলারের খরচই ছিল বাজেট বরাদ্দের বাইরে।

 

Loading


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ