• বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন

দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিলে ভারী বর্ষণ-বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৩

admin
আপডেটঃ : বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বিশ্ব ডেস্ক রিপোর্টঃ দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিলে টানা মুষলধারে বৃষ্টিপাত ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে। মিনাস গেরাইস রাজ্যে প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও একের পর এক ভূমিধসে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৩ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৪০ জনেরও বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে দিনরাত কাজ করছেন জরুরি সেবা বিভাগের সদস্যরা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে অনুসন্ধান অভিযান, আর স্বজনদের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন অসংখ্য পরিবার।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জুইজ ডি ফোরা শহর। সেখানে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের স্তূপে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনুসন্ধানী কুকুর নিয়ে তল্লাশি চালান। সোমবার থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টির পরই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। বহু মানুষ তখন থেকে নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।

এই দুর্যোগে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির গল্পও সামনে আসছে। ৪৪ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা লিভিয়া রোজা জানিয়েছেন, তার কয়েকজন আত্মীয় কাদার নিচে চাপা পড়েছেন। তিনি বলেন, “গত রাত থেকে আমরা এখানে আছি। তারা বেঁচে আছে কি না, শুধু সেটাই জানতে চাই। আশা ছাড়া আমাদের আর কিছু নেই।” তার মতো অসংখ্য মানুষ উদ্ধারস্থলের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন প্রিয়জনের খবরের জন্য।

আকাশপথে ধারণ করা ছবিতে দেখা গেছে, শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা কাদা ও পানিতে তলিয়ে গেছে। একটি স্ফীত নদী গতিপথ পরিবর্তন করে নতুন নতুন এলাকায় প্লাবন সৃষ্টি করেছে, ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে। রিও ডি জেনিরো থেকে প্রায় ৩১০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত জুইজ ডি ফোরা এখন এক গভীর সংকটের মুখে। এ পর্যন্ত অন্তত ৪৪০ জন বাসিন্দা ঘরছাড়া হয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে তাদের জন্য অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নিকটবর্তী উবা শহরেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানে কমপক্ষে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। পৃথকভাবে উদ্ধার অভিযান চলছে, কারণ বেশ কয়েকটি এলাকায় ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি।

জুইজ ডি ফোরার মেয়র মার্গারিডা সালোমাও জানিয়েছেন, শহরে অন্তত ২০টি বড় ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে এবং বহু বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। তার ভাষায়, “মাত্র চার ঘণ্টায় ১৮০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে—এটি ছিল তীব্র, ধ্বংসাত্মক ও অবিরাম। আমার প্রশাসনের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে দুঃখজনক দিন।” অল্প সময়ের মধ্যে এত বিপুল বৃষ্টিপাতের কারণে মাটি আলগা হয়ে পড়ে এবং পাহাড়ি ঢাল থেকে কাদা নেমে আসে বসতিপূর্ণ এলাকায়।

ফায়ার ব্রিগেডের মেজর ডেমেট্রিয়াস গৌলার্ট জানান, বৃষ্টির সময় অধিকাংশ মানুষ নিজ নিজ ঘরে ছিলেন। ফলে আকস্মিক ভূমিধসে অনেকেই ঘরের ভেতরেই আটকে পড়েন। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক শিশুকে জীবিত উদ্ধারের খবর কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। শিশুটিকে বের করতে উদ্ধারকর্মীদের প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লেগেছে।

উদ্ধার কার্যক্রমে ব্যাপক জনবল মোতায়েন করা হয়েছে। কর্পো ডি বোম্বেইরোস মিলিটার ডি মিনাস গেরাইস–এর অন্তত ১০৮ জন সদস্য জুইজ ডি ফোরায় এবং আরও ২৮ জন উবায় কাজ করছেন। তারা ভারী যন্ত্রপাতি, অনুসন্ধানী কুকুর এবং বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের সন্ধান করছেন।

এদিকে লুইজ ইনাসিউ লুলা দা সিলভা এক বার্তায় জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকবে। তিনি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, মৌলিক সেবা পুনরুদ্ধার, বাস্তুচ্যুতদের সহযোগিতা এবং পুনর্গঠনে সর্বাত্মক সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে আবহাওয়া দপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী দিনগুলোতেও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, যা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এই মুহূর্তে মিনাস গেরাইসের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে চলছে জীবন রক্ষার লড়াই। একদিকে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ, অন্যদিকে আশ্রয়, খাবার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে উৎকণ্ঠা—নিখোঁজদের খোঁজ মিলবে কি না, আর কত প্রাণহানির খবর সামনে আসবে। তবুও আশার আলো জ্বালিয়ে রেখে উদ্ধারকর্মীরা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন, আর স্বজনরা প্রার্থনা করছেন—ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে যেন আরও জীবনের সাড়া মেলে। তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা

Loading


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ