জাতীয় ডেস্ক রিপোর্টঃ দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ণ রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) পরিশোধন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাপে পড়েছে জ্বালানি তেল খাত। বিশেষ করে পেট্রল ও অকটেনের সঙ্কট আরো প্রকট হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে এই সঙ্কট মোকাবেলায় পরিশোধিত তেল আমদানি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন-বিপিসি।
গত দুই দিনে ৭০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল ও জেট ফুয়েল নিয়ে আরো তিনটি অয়েল ট্যাঙ্কার চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে। চলতি সপ্তাহে আরো দুটি ডিজেলবাহি ট্যাঙ্কার আসার কথা রয়েছে। তবে ইস্টার্ণ রিফাইনারী সচল করতে ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজ আসার কোন সুখবর আপাতত নেই। পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল আমদানির পরও চট্টগ্রামসহ সারা দেশে তেলের জন্য হাহাকার চলছে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের ভিড় লেগেই আছে। যতই দিন যাচ্ছে জ¦ালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা ততই বাড়ছে। তেলের অভাবে গণপরিবহনসহ অনেক পরিবহন রাস্তায় নামতে পারছে না। তাতে গণপরিবহন সঙ্কটে জনদুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ইস্টার্ণ রিফাইনারিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় এবং ইরান যুদ্ধ শুরুর পর নতুন করে কোন চালান না আসায় ডিজেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। বিপিসি ও রিফাইনারি সূত্র জানায়, শোধনাগারটির অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার টন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে মজুত ছিল প্রায় দেড় লাখ টন। তবে চলতি মাসের শুরুতে ব্যবহারযোগ্য মজুত নেমে আসে তলানিতে। সংকটের মধ্যে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম)’ প্রকল্পের ট্যাংকে থাকা আরো প্রায় পাঁচ হাজার টন অপরিশোধিত তেল সম্প্রতি রিফাইনারিতে আনা হয়েছে। এই তেলও ফুরিয়ে গেছে।
এরপর ‘ডেডস্টক’ হিসাবে থাকা প্রায় ৩৩ হাজার টন তেল দিয়ে সীমিত আকারে পরিশোধন চালু রাখা হয়। এখন পরিশোধনের প্রথম ধাপের কার্যক্রম ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিটের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ডিজেল উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, স্বল্প পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করা যাচ্ছে। সেখান থেকে কিছু পেট্রল ও অকটেন সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। এই উৎপাদন আর কয়েকদিন চালু রাখা যাবে। তবে ডিজেল উৎপাদন থেমে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি তেল খাত আরো চাপে পড়েছে।
বিপিসির হিসাবে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি ৫০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা খরচ করে ৬২ লাখ ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ১০ হাজার টন, অর্থাৎ প্রায় ২৪ শতাংশ। বাকি ৭৬ শতাংশই ছিল পরিশোধিত তেল, যা সরাসরি ব্যবহারযোগ্য। বন্ধ হওয়ার আগে ইস্টার্ন রিফাইনারি দিনে চার হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করছিলো।
এদিকে তেল সঙ্কটের মধ্যেই ৬৮ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আরো দুইটি ট্যাঙ্কার নোঙ্গর করেছে চট্টগ্রাম বন্দরে। গতকাল বুধবার এই দুটি ট্যাঙ্কার থেকে তেল খালাস শুরু হয়। তার আগে মঙ্গলবার মধ্যে রাতে ট্যাঙ্কার দুটি বন্দরের বহির্নোঙ্গরে পৌঁছায়। বহির্নোঙ্গরে কিছু ডিজেল খালাস শেষে ট্যাঙ্কার দুটি ডলফিন জেটিতে এনে বাকী ডিজেল খালাস করা হচ্ছে।
‘এমটি টর্ম দামিনি’ ট্যাঙ্কারে রয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার টন ডিজেল। সরবরাহ করেছে ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড। ‘এমটি লুসিয়া সলিস’ ট্যাঙ্কারে আছে প্রায় ৩৫ হাজার টন ডিজেল। সরবরাহকারী কোম্পানি সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়া। তার আগে মঙ্গলবার সিঙ্গাপুর থেকে ১২ হাজার টন জেট ফুয়েল নিয়ে বন্দরে আসে আরো একটি ফুয়েল ট্যাঙ্কার। ডলফিন জেটিতে এ বিমান জ্বালানি খালাস শেষ পর্যায়ে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, ইতিমধ্যে কয়েকটি জাহাজ এসেছে, সামনে আরো আসবে। চুক্তিবদ্ধ সরবরাহকারীদের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও তেল আমদানির চেষ্টা চলছে। চলতি মাসে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ১১ হাজার টনের বেশি ডিজেল বিক্রি হচ্ছে। ১২ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে সরবরাহযোগ্য ডিজেলের মজুত ছিল এক লাখ ১৯ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ১০ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল। নতুন চালান যুক্ত হওয়ায় মজুত আরো দুই সপ্তাহ বাড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারত থেকে বাংলাদেশ ডিজেল আমদানি করে। ফলে বিশ^বাজারে ডিজেলের দাম বাড়লেও আমদানির ক্ষেত্রে কোন সঙ্কট নেই। চলতি সপ্তাহে ৬০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আরও দুটি জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ১৬ থেকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে অতিরিক্ত এক লাখ ৯৮ হাজার টন ডিজেলসহ প্রায় ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েল আসার কথা রয়েছে।
আমদানি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী মাসগুলোতে সরবরাহ আরো বাড়ানো হবে। মে মাসে দেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ হাজার টন ডিজেল, ৪০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন ও ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আসার কথা রয়েছে। জুনের জন্য বিপিসি প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজার টন ডিজেল, ৬০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন ও ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির পরিকল্পনা করেছে।
অপরদিকে আটকে পড়া দুটি ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া অন্য উৎস থেকে ক্রুড অয়েল আমদানিরও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জানা গেছে, মালয়েশিয়া থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এখনো নিরাপত্তা জামানত (পিজি) জমা দেয়নি। ফলে এই মাসে নতুন চালান আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে আগামী মাসের শুরুতে একটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ২ মার্চ সউদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে অপরিশোধিত তেল নিতে গিয়ে যুদ্ধের কারণে আটকে যায় একটি জাহাজ। ‘নরডিক পলুকস’ নামের ওই জাহাজে ৩ মার্চ অপরিশোধিত তেল তোলা হয়। পরে রওনা দিলেও পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় সেটি আবার রাস তানুরা টার্মিনালে ফিরে যায়। এটি এখনো সেখানেই আটকে আছে।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) থেকেও এক লাখ টন তেল আনার কথা ছিল গত মাসে। ওই চালান আসাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, চলতি এপ্রিলেও রাস তানুরা বন্দর থেকে এক লাখ টন তেল আসার কথা রয়েছে। বিকল্প হিসেবে সউদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, আটকে থাকা জাহাজ বিকল্প উপায়ে দেশে আনার চেষ্টা চলছে। তবে যুদ্ধবিরতি হলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এ কারণে কবে তেল আনা সম্ভব হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ফলে ইস্টার্ণ রিফাইনারীও সহসা চালু হচ্ছে না। এ রিফাইনারী এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে প্রায় ৪০ হাজার টন ডিজেল, ১৫ থেকে ২০ হাজার টন পেট্রল ও অকটেন এবং প্রায় ৩০ হাজার টন ফার্নেস তেল উৎপাদন করে। ফলে পেট্রল ও অকটেনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো দেশীয় শোধনাগারের ওপর নির্ভরশীল। এই উৎপাদন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে পরিবহন ও ভোক্তা পর্যায়ে চাপ তৈরি হতে পারে।
উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর পর পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে জ্বালানি পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এতে বাংলাদেশের আমদানিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি হলেও এখনো হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
![]()