আন্তর্জাতিক ডেস্ক রিপোর্টঃ শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন বিষয় প্রকাশ করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। তবে এসব তথ্যের বিষয়ে এখনো যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরানের কোনো সরকারি তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সোমবার (১৫ জুন) ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দুই দেশের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দেন। এর কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এরপর ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ চুক্তির সমঝোতা স্মারকে থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশ করে। সেগুলো হলো—
১. লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে।
২. ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র।
৩. আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে থাকা মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে।
৪. ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে।
৫. ইরানের তত্ত্বাবধানে ৩০ দিনের মধ্যে পুনরায় খুলে দেওয়া হবে হরমুজ প্রণালি।
৬. ইরানের পুনর্গঠনের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা ও সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা।
৭. ইরানের তেল ও জ্বালানি পণ্যের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।
৮. পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবে ইরান।
৯. ওই অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি না করা এবং নতুন করে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার প্রতিশ্রুতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র।
মেহর নিউজের খবরে আরও বলা হয়, নিষেধাজ্ঞার আওতায় জব্দ করা ইরানি তহবিলের অর্ধেক মুক্ত না করা, ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা এবং মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরু হবে না।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে চূড়ান্ত চুক্তি হবে, তা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে বলেও জানানো হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন, ‘আমি হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ টোলমুক্তভাবে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার অনুমতি দিচ্ছি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর আরোপিত অবরোধও অবিলম্বে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি।’
বিশ্বের জাহাজগুলোকে ইঞ্জিন চালু করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তেল পরিবহন আবারও স্বাভাবিকভাবে চলবে।
পরে আরেকটি পোস্টে ট্রাম্প বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেন। তিনি লেখেন, অন্যরা যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে তিনি সফল হয়েছেন।
ট্রুথ সোশ্যালে তিনি আরও লেখেন, ‘এই মহান চুক্তি পুরো অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আসবে। অনেক প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু আমার আগে সবাই ব্যর্থ হয়েছেন। ওই অঞ্চলের নেতারা এবার প্রথম এমন একজন প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন, যিনি প্রকৃত শান্তি অর্জনে তাদের সহায়তা করতে পারেন।’
ট্রাম্প আরও জানান, শুক্রবার চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে এবং হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণের পর ওই প্রণালির উভয় পাশ দিয়ে অঞ্চলটির পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও তেল পরিবহন স্বাভাবিক হবে।
এদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই শান্তিচুক্তির ঘোষণা সহজভাবে নিচ্ছে না ইসরাইল। ইতোমধ্যে দেশটির ডানপন্থি সংবাদমাধ্যমগুলোতে ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে আল–জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব সংবাদমাধ্যম সাধারণত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ফলে হঠাৎ করেই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান নেওয়া বেশ অস্বাভাবিক ঘটনা। কারণ, অল্প কিছুদিন আগেও বিভিন্ন জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর তুলনায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বেশি দেখা গিয়েছিল।
বর্তমানে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অবস্থানে আগের মতো মিল নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ট্রাম্পের এই চুক্তির ফলে ইসরাইল লেবাননে বোমাবর্ষণ বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। এমনকি দেশটি লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার বা সামরিক অভিযান স্থগিতও করতে পারে।
মূলত এ কারণেই ইসরাইলের কট্টরপন্থিদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা এই চুক্তিকে ইসরাইলের জন্য রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, তেহরানে এই চুক্তিকে বিজয় হিসেবে উদ্যাপন করা হবে এবং ইরানের সেই বিজয় শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের জন্য একটি ‘কৌশলগত পরাজয়’ হিসেবেই বিবেচিত হবে। সূত্র: বিবিসি
![]()