অনলাইন ডেস্কঃ দুই দশকের বেশি সময় ধরে ফুটবল বিশ্বে রাজত্ব করেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। গোল, ব্যক্তিগত অর্জন কিংবা দলের সাফল্য—প্রায় সব ক্ষেত্রেই নিজের সামর্থ্যের ছাপ রেখেছেন পর্তুগিজ এই মহাতারকা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার দীর্ঘ পথচলায় যুক্ত হয়েছে অসংখ্য রেকর্ড।
গত বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দেওয়ার পর আলোচনায় এসেছে তার রেখে যাওয়া সেই কীর্তিগুলো। এর মধ্যে এমন নয়টি রেকর্ড রয়েছে, যেগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
১. আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোল
জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ড রোনালদোর দখলে। পর্তুগালের জার্সিতে তার গোলসংখ্যা ১৪৬। দ্বিতীয় স্থানে থাকা লিওনেল মেসির চেয়ে ২০ গোল এগিয়ে রয়েছেন তিনি। একসময় রোনালদোর সঙ্গে এই রেকর্ডের লড়াইয়ে থাকা ইরানের আলী দাইয়ি এখন অনেকটা পিছিয়ে।
সক্রিয় ফুটবলারদের মধ্যে রোমেলু লুকাকু ৯৪ গোল নিয়ে রয়েছেন চতুর্থ স্থানে। ফলে রোনালদোর রেকর্ড ভাঙা তার পক্ষে অসম্ভব হতে পারে। রবার্ট লেভানডোভস্কির গোলও ৯২টি। অন্যদিকে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে রোনালদোর রেকর্ড ছাড়াতে আরও ৫০টির বেশি গোল করতে হবে। এই ব্যবধান ঘোচানো সহজ হবে না কারও জন্য।
২. আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ
শুধু গোল করেই নয়, জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও গড়েছেন রোনালদো। পর্তুগালের হয়ে ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি মাঠে নেমেছেন ২৩৪ ম্যাচে।
এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেসির ম্যাচসংখ্যা ২০৮। অর্থাৎ আর্জেন্টাইন তারকার চেয়ে ২৬ ম্যাচ বেশি খেলেছেন রোনালদো। সক্রিয় ফুটবলারদের মধ্যে কাতারের হাসান আল হায়দোস ১৯৩ ম্যাচ নিয়ে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে থাকলেও রোনালদোর রেকর্ড থেকে এখনো অনেক দূরে।
৩. ৩০ বছর বয়সের পর সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোল
রোনালদোর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি হলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। ৩০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে পর্তুগালের হয়ে তার গোল ছিল ৫২টি। অথচ ৩০ বছর পেরিয়ে একই জাতীয় দলের হয়ে করেছেন আরও ৯৪ গোল।
এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মেসি ৩০ বছর বয়সের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে করেছেন ৬৮ গোল। বয়সের পরিসংখ্যানকে এভাবে পেছনে ফেলে দেওয়ার নজির খুব কমই আছে ফুটবলে। তাই রোনালদোর এই রেকর্ডও ভবিষ্যতে অতিক্রম করা কঠিন হতে পারে।
৪. সবচেয়ে বেশি আলাদা ম্যাচে গোল
কেবল মোট গোলের হিসাবেই নয়, কতগুলো ভিন্ন ম্যাচে গোল করেছেন, সেই তালিকাতেও শীর্ষে রোনালদো। পর্তুগালের হয়ে ৯৬টি আলাদা ম্যাচে গোল করেছেন তিনি।
দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত গোল করার সক্ষমতাই এই রেকর্ডের মূল ভিত্তি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদো ছাড়াও মেসি ও আলী দাইয়ি এই বিশেষ কীর্তির তালিকায় রয়েছেন। তবে ৯৬টি ভিন্ন ম্যাচে গোল করার রেকর্ড রোনালদোকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
৫. সবচেয়ে বেশি জাতীয় দলের বিপক্ষে গোল
আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিপক্ষের বৈচিত্র্যের দিক থেকেও এগিয়ে রোনালদো। পর্তুগালের হয়ে ৪৯টি ভিন্ন দেশের জাতীয় দলের বিপক্ষে গোল করেছেন তিনি। এই ক্ষেত্রে মেসির চেয়ে তিনটি বেশি দেশের বিপক্ষে জালের দেখা পেয়েছেন পর্তুগিজ তারকা।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে বিভিন্ন মহাদেশের দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাওয়া একজন ফুটবলারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এতগুলো ভিন্ন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সহজ নয়। রোনালদোর দীর্ঘ ক্যারিয়ার এই রেকর্ড গড়তে বড় ভূমিকা রেখেছে।
৬. টানা ২৩ বছরে গোলের কীর্তি
রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি প্রায় ২৩ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিটি বছরই গোল করেছেন তিনি। অর্থাৎ ক্যারিয়ারের কোনো বছর গোল না পাওয়ার ঘটনা ঘটেনি তাঁর।
এই রেকর্ড স্পর্শ করতে হলে একজন ফুটবলারকে খুব অল্প বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক করতে হবে। এরপর দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলা চালিয়ে যেতে হবে এবং প্রতি বছর অন্তত একটি গোল করতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ।
৭. ইউরোতে সর্বোচ্চ গোল
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বা ইউরোতে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনটিও রোনালদোর। টুর্নামেন্টটির বিভিন্ন আসরে অংশ নিয়ে তিনি করেছেন ১৪ গোল।
এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন ফ্রান্সের কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনি। তাঁর গোলসংখ্যা ৯। অন্যদিকে স্পেনের আলভারো মোরাতা ও ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইনের গোল ৭টি করে।
রোনালদোর রেকর্ড থেকে পরবর্তী প্রজন্মের ফুটবলারদের বেশ কয়েকটি গোল দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। বিশেষ করে ইউরোর মতো চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে এমন অর্জন সহজ নয়।
৮. ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে সর্বোচ্চ ম্যাচ
ইউরোতে গোল করার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও রোনালদোর। ইউরোপের সবচেয়ে বড় জাতীয় দলীয় প্রতিযোগিতায় তিনি খেলেছেন মোট ৩০ ম্যাচ।
এই রেকর্ডের পেছনে রয়েছে তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এবং একাধিক ইউরো আসরে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা। একটি ইউরো আসরে কোনো দল সর্বোচ্চ সাতটি ম্যাচ খেলতে পারে। ফলে রোনালদোর ৩০ ম্যাচের রেকর্ড ছাড়াতে একজন ফুটবলারকে একাধিক আসরে নিয়মিত খেলতে হবে। প্রতিটি আসরে দলকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
৯. ছয় বিশ্বকাপ আসরে গোল
বিশ্বকাপের ইতিহাসেও অনন্য একটি কীর্তি রয়েছে রোনালদোর। গোলরক্ষক বাদে তিনিই প্রথম ও একমাত্র খেলোয়াড়দের একজন, যিনি বিশ্বকাপের ছয়টি আসরে অংশ নিয়ে প্রতিটিতেই গোল করেছেন। তার সঙ্গে ছয়টি আসরে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে মেসিরও। তবে প্রত্যেক আসরে গোল করার বিশেষ রেকর্ডটি রোনালদোর দখলে।
এই অর্জন ভবিষ্যতে স্পর্শ করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় চার বছর পরপর। একজন ফুটবলারকে প্রায় দুই দশক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় থাকতে হবে। পাশাপাশি তার দেশকে ছয়টি আসরের প্রতিটিতে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে হবে এবং তাকেও প্রত্যেক আসরে গোল করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে রোনালদোর দীর্ঘ একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। তবে জাতীয় দলের হয়ে গড়া তার রেকর্ডগুলো সহজে মুছে যাওয়ার নয়। গোলের ধারাবাহিকতা, দীর্ঘ ক্যারিয়ার, ইউরো ও বিশ্বকাপের অর্জন—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন পর্তুগিজ মহাতারকা।
![]()