আন্তর্জাতিক ডেস্ক রিপোর্টঃ ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায়ের মূল শোক মিছিল গতকাল সোমবার সকালে রাজধানী তেহরানে শুরু হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই শেষ বিদায়ের মিছিলে যোগ দিতে লাখ লাখ মানুষ তেহরানের রাস্তায় নেমে এসেছেন। সরকারি কর্মকর্তারা এই শোক মিছিলকে আধুনিক ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জনসমাগম বলে বর্ণনা করেছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের নিজ বাসভবনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন খামেনি। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে ৪০ দিন ধরে চলা আগ্রাসী যুদ্ধের সূচনালগ্নে তিনি নিহত হন। ১৯৮৯ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর পর গত মার্চ মাসে তার ছেলে মোজতবা খামেনি দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভির খবরে বলা হয়, খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার এই অনুষ্ঠান গত শুক্রবার থেকে শুরু হয়। প্রথমদিনে বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা প্রয়াত নেতাকে শ্রদ্ধা জানান। এরপর শনি ও রোববার তেহরানের বৃহত্তম ধর্মীয় কমপ্লেক্স গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে লাখ লাখ ইরানি সমবেত হন। রোববার সকালে সেখানে খামেনির পরিবারের সদস্য, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের কলিবাফসহ ঊর্ধ্বতন নেতাদের উপস্থিতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সরকারপন্থি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বার্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তেহরান সুচিন্তিত বক্তব্য ও পরিকল্পিত কর্মসূচির মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা সরকারের সমর্থকদের মধ্যে ঐক্যের চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। সরকারিভাবে খামেনির মৃত্যুকে ‘শাহাদত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিক স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আমাদের উঠে দাঁড়াতে হবে’। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে খামেনির একটি মুষ্টিবদ্ধ হাতের চিত্র। এটি তার ছেলে মোজতবা খামেনির একটি খুদে বার্তা থেকে অনুপ্রাণিত। ১৯৮১ সালে বোমা হামলায় গুরুতর আহত হয়ে খামেনি তার ডান হাতের কার্যক্ষমতা হারিয়েছিলেন। মোজতবার বার্তা অনুযায়ী, ওই সময় খামেনির সুস্থ বাম হাতের মুষ্টি শক্ত করে বন্ধ ছিল। তবে নিরাপত্তার কারণে মোজতবা খামেনি বাবার শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে প্রকাশ্যে অংশ নেবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এএনআইয়ের খবরে বলা হয়, গত রোববার বিকালে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, নিজেদের নেতাকে শেষবিদায় জানাতে সমবেত জনসমুদ্র শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং শহিদ নেতার রক্তের প্রতিশোধের স্লোগান দিচ্ছে। গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে একটি বিশাল লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। পতাকাটিতে আরবি ভাষায় ‘হে, হুসেনের প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা’ লেখা রয়েছে। এর মাধ্যমে খামেনির হত্যাকাণ্ডকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ বছর আগের কারবালার ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
ইরানের গণমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, বিভিন্ন সাজসজ্জা ও প্রচারে কালো ও লাল রঙের ব্যাপক ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুই রঙের মাধ্যমে শোক, শাহাদাত এবং প্রতিশোধের আহ্বান— এই তিন বার্তা একসঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে। এর আগে ২০২০ সালে মার্কিন হামলায় জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। এবারও বিভিন্ন প্রতীকী বার্তার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়াকে ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, খামেনির লাশ বহনের জন্য যে পথ বেছে নেওয়া হয়েছে, সেটিও একটি বিশেষ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বার্তা বহন করে। তেহরান থেকে শুরু হওয়া এই শোকযাত্রা শিয়া সম্প্রদায়ের পবিত্র শহর কোম হয়ে প্রতিবেশী দেশ ইরাকের নাজাফ ও কারবালা অতিক্রম করবে। এরপর বৃহস্পতিবার ইরানের মাশহাদ শহরে ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হবে। ইরাকের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধেই কফিন ইরাকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তাসনিম নিশ্চিত করেছে।
![]()