জাতীয় ডেস্ক রিপোর্টঃ সারাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। আক্রান্ত শিশুদের ভিড়ে হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও শরীরে লালচে র্যাশ নিয়ে প্রতিদিন শত শত শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং সংক্রমণ রোধে অনেক হাসপাতালেই ইতোমধ্যে পৃথক ‘আইসোলেশন ইউনিট’ খোলা হয়েছে।
সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান
স্বাস্থ্য অধিদফতরের (ডিজিএইচএস) ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে মোট ৬,৪৭৬ জন সম্ভাব্য হামে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪,৬২৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২,৬৫৪ জন।
একই সময়ে দেশে মোট ১১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জন নিশ্চিতভাবে হামের কারণে এবং বাকি ৯৮ জন সম্ভাব্য হামজনিত জটিলতায় মারা গেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭৮৭ জন সম্ভাব্য রোগী শনাক্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম ধরা পড়েছে ৬০ জনের এবং মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের।
বিভাগীয় চিত্র ও হটস্পট
আক্রান্তের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগে ২,৭৬৯ জন। এরপর যথাক্রমে রাজশাহী— ১,৩০৮, চট্টগ্রাম— ৭৬৯, খুলনা— ৬৩১, বরিশাল— ৪০৫, সিলেট— ৩০০, রংপুর— ১৬৭ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১২৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সম্ভাব্য রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে ৩১৫ জন। এরপর যথাক্রমে রাজশাহী— ২০৮, চট্টগ্রাম— ১১৪, খুলনা— ৭৭, বরিশাল— ৩৪, সিলেট— ১৯, রংপুর— ১৭ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২৮ মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৫৬টি জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার, বরগুনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর জেলাকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকাকে সংক্রমণের ‘হটস্পট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুযায়ী বর্তমানে কক্সবাজারে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি।
সকাল থেকে জরুরি এমআর ক্যাম্পেইন
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রবিবার (৫ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে ১৮টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় জরুরি ‘মিজলস-রুবেলা (এমআর)’ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। এই ক্যাম্পেইনের আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সকল শিশুকে টিকা দেওয়া হবে, এমনকি যারা আগে টিকা নিয়েছে তারাও এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হবে।
সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জানান, ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপের (এনআইটিএজি) সুপারিশে এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং কোনও ধরনের গুজবে কান না দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। সরকার আগামী ২১ মে’র মধ্যে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এই টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
টিকাদান কর্মসূচির আওতাভুক্ত এলাকা
প্রাথমিক পর্যায়ে বরগুনা, পাবনা, চাঁদপুর, কক্সবাজার, গাজীপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বরিশাল, নওগাঁ, যশোর, নাটোর, মুন্সীগঞ্জ, ঝালকাঠি, শরীয়তপুর ও ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জসহ নির্দিষ্ট ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় এই কার্যক্রম চলবে।
অভিভাবকদের প্রতি নির্দেশনা
পাঁচ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে আনার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে শিশু অসুস্থ বা জ্বরে আক্রান্ত থাকলে সুস্থ হওয়ার পর তাকে টিকা দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া জটিলতা কমাতে আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুলও প্রদান করা হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনও ৫ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৫টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডের ১০টি কেন্দ্রে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করবে। এখানে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা হবে।
![]()