জাতীয় ডেস্ক রিপোর্টঃ ঈদ মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব। মুসলমানদের কাছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা-এই দুই আনন্দের উৎসব। ঈদ মানেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা। আর এ লক্ষ্যে জীবিকার তাগিদে যে যেখানেই থাকুক না কেন, এই দুটি উৎসবে সবাই ছুটে যায় আপনজন বা পরিবারের কাছে। তারা ঈদযাত্রার জন্য বাস, ট্রেন অথবা লঞ্চ ব্যবহার করেন। তাও আবার নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়। প্রশাসনের অবহেলায় এই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কোনোভাবেই বন্ধ করা যায়নি। এমনকি প্রতিটি পরিবহন যানে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের ঝুঁকিও দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবছরের মতো এবারো ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের ব্যাপক যাতায়াত দেখা গেছে। কিন্তু আনন্দের এই যাত্রা অনেকের জন্য পরিণত হয়েছে শোকের ঘটনায়। এবারের ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানিÑ দুটোই আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এবারের ঈদের আনন্দযাত্রা মূলত মরণযাত্রায় রূপ নিয়েছে, যা কখনোই কাম্য ছিল না।
সড়ক নিরাপত্তায় কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, এবারের ঈদুল ফিতরের আগে ও পরে গত ১০ দিনে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন। সংগঠনটির তথ্যমতে, ১৭ থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত সারাদেশে মোট ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৭৪ জন।
ADVERTISEMENT
গত বছর ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ১১ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন নিহত হয়েছিলেন। সে হিসাবে এবারের ঈদে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। অথচ এবার ঈদ উপলক্ষে ছুটির পরিমাণ বেশি ছিল। এ পর্যন্ত দেশে ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছিল ২০২২ সালে। তখন সারাদেশে দুর্ঘটনায় তিরশ’র বেশি নিহত হয়েছিল। এবারের ঈদযাত্রায় কিছু দুর্ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। গত ২১ মার্চ রাতে কুমিল্লায় বাস ও ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হন। এর কয়েক দিন পর ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় পদ্মা নদীতে একটি যাত্রীবাহী বাস ডুবে ২৬ জনের মৃত্যু হয়। ধারণা করা হচ্ছেÑ আরো অনেক যাত্রী নিখোঁজ রয়েছে। যদিও গতকালও নিখোঁজদের খোঁজে অভিযান চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এবারে বগুড়ার সান্তাহারে ঢাকা থেকে চিলাহাটিগামী নীল সাগর এক্সপ্রেস ট্রেন দুর্ঘটনায় কয়েকজন আহত হলেও হাজার হাজার যাত্রীকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অথচ সড়ক ও রেলমন্ত্রী আগে থেকেই বলে আসছিলেন এবার বাস, লঞ্চ এবং ট্রেনে কোনো অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে দেয়া হবে না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। দুর্ঘটনা-কবলিত নীল সাগর ট্রেনের ছাদে প্রায় ১ হাজার যাত্রী ছিল। এদের কেউ ঢাকা থেকে, কেউ বিমানবন্দর স্টেশন থেকে এবং বেশির ভাগ যাত্রী উঠেছিল টঙ্গী ও জয়দেবপুর থেকে। রেলকর্মীরা জানান, অবস্থা এমনি ছিল যে, ট্রেনের ইঞ্জিনেও এত বেশি যাত্রী ছিল যে, চালক সামনের দিকে কিছুই দেখতে পারছিলেন না। অথচ সান্তাহারের কিছু দূরে রেললাইন মেরামতের কাজ চলছিল। এমনকি সেখানে লাল পতাকাও টানানো ছিল। চালক সেটিও দেখতে পাননি। প্রশ্ন হলোÑ তাহলে ট্রেনে অবস্থান করা রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী কীভাবে এত যাত্রীকে ট্রেনের ইঞ্জিনে বা ছাদে উঠতে দিল?
দৌলতদিয়া ঘাটে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাস যখন পল্টুনে ওঠার জন্য পল্টুন থেকে যে পরিমাণ দূরত্বে দাঁড়ানোর কথা। তা ছিল না। এমনকি ওই মুহূর্তে আরেকটি ফেরি এসে পল্টুনে সজোরে ধাক্কা দেয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। এতে করে চালক বাসটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ঢাকা থেকে খুলনাগামী ফাল্গুনী-মধুমতি পরিবহনের একটি এসি বাসের নিয়মিত চালক হাসান মাহমুদ। বছরের অন্যান্য সময়ে তিনি সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন ডিউটি করেন। যদি এক দিন ও এক রাত টানা ড্রাইভিং করেন, তাহলে পরবর্তী অন্তত এক দিন এক রাত বা দুই দিন বিশ্রামে থাকতে হয়। কিন্তু ঈদযাত্রায় ট্রিপের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এবং চালকের সংকট থাকায় এবারের ঈদের প্রথম ধাপে তিনি টানা তিন দিন ডিউটি করেছেন।
ADVERTISEMENT
এই দূরপাল্লার বাসচালক বলেন, ঈদের আগের চার-পাঁচ দিন আমাদের ডিউটি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে শেষ তিন দিন খাওয়া-ঘুমেরও সময় থাকে না। এমনও হয়েছেÑ ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে খুলনায় পৌঁছে ড্রাইভিং সিট থেকে নামার সুযোগ পাইনি, আবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছি। এভাবে চার থেকে ছয়টি ট্রিপ দিলেও ঠিকমতো বিশ্রাম পাইনি। তিনি আরো বলেন, মাঝেমধ্যে খালি গাড়ি নিয়ে ফেরার সময় কিছুটা পথ হেলপার গাড়ি চালায়, তখন একটু ঘুমিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি। তবে সেটাও সব সময় সম্ভব হয় না।
গবেষণা বলছে, প্রতি বছরের মতো এবারো ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের ব্যাপক যাতায়াত দেখা গেছে। কিন্তু আনন্দের এই ঈদযাত্রা অনেকের জন্য পরিণত হয়েছে মরণযাত্রায়। ঈদের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি মানুষ যাতায়াত করে। এতে করে বাস, লঞ্চ, ট্রেনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা, ছাদে ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ভ্রমণ করা হয়। চালকের ক্লান্তি ও বেপরোয়া গতি, একাধিক ট্রিপ দেয়ার চাপ, বাসচালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং দ্রুত পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এর সাথে রয়েছে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ যান, বাসের রুট না মানা। গতকাল শুক্রবারও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে রাজশাহীগামী বাস দেখা গেছে। যেগুলো সম্ভবত ঈদে নির্ধারিত রুট না মেনে রাজশাহী বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম অথবা কুমিল্লা, নোয়াখালী কিংবা আরো দূরত্বের কোনো গন্তব্যে গিয়েছিল।
কয়েকজন বাসচালকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঈদযাত্রায় বাস দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ব্রেক/টায়ারের ত্রুটি, অনুমোদনহীন গাড়ি চলাচল, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক দিয়ে গাড়ি চালানো, এর মধ্যে অনেক চালকের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই, লাইসেন্স যাচাইয়ে প্রশাসনের দুর্বলতা, সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মহাসড়কে শৃঙ্খলার অভাব, ট্রাফিক আইন প্রয়োগে ঘাটতি, অপরিকল্পিত ওভারটেকিং, মহাসড়কে ছোট যানবাহনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল।
পুলিশ সদর দফতরের এক গবেষণা বলছে, ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনার মূলে রয়েছে চালকদের বেপরোয়া গতি। এছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং লাইসেন্সবিহীন চালকদের দৌরাত্ম্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে সড়ক প্রশাসনের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করা, চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং মহাসড়কে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল এমন অনাকাক্সিক্ষত মরণযাত্রা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তাই সরকারি ছুটি উপলক্ষে দুই ঈদ উদযাপনের লক্ষ্যে এসব কর্মজীবী মানুষ কর্মস্থলের শহরগুলো থেকে নিজ নিজ জেলায় রওনা হন। ঈদের আনন্দ উদযাপনের উদ্দেশ্যে শহরগুলো থেকে একসঙ্গে কয়েক কোটি মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যে যাত্রা করেন। প্রচলিতভাবে ঈদের আগের তিন দিন ঘরমুখো মানুষের এই ঢল সামাল দিতে হয় দেশের পরিবহন ব্যবস্থাকে। ঈদের আগের ও পরের তিন দিনে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ যাত্রী বেড়ে যাওয়ায় এর চাপ পড়ে গণপরিবহন ও মহাসড়কে।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদযাত্রার সড়ক দুর্ঘটনাগুলো দেশের পরিবহন খাতের দুর্দশা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। গত বছর ঈদ উপলক্ষে সরকারি ছুটি এবারের চেয়ে কম ছিল। তার পরও গতবারের তুলনায় এবার দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর হার অনেক বেশি। এসব দুর্ঘটনার পেছনে নানা কারণ থাকলেও চালকদের নির্ঘুম ড্রাইভিং ও শারীরিক ক্লান্তিকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদ উপলক্ষে মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ানো হলেও তা বিপুল যাত্রীর চাপ সামলাতে যথেষ্ট নয়। ফলে যানবাহনের ট্রিপ সংখ্যা বাড়াতে হয়। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় ঈদের আগে ও পরে ট্রিপ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। কিন্তু এই বাড়তি চাপ সামলাতে চালক বা সহকারীর সংখ্যা বাড়ানো হয় না।
অভিজ্ঞদের মতে, একজন চালকের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার কথা বিবেচনা করে সাধারণত টানা চার ঘণ্টা ড্রাইভিংয়ের পর অন্তত চার ঘণ্টা বিশ্রামের বিধান রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে ঈদযাত্রায় অনেক চালক ও সহকারী টানা তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত নির্ঘুম থেকে কাজ করেন। ফলে গাড়ি চালানোর সময় তারা মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে মিশ্র পরিবহন ব্যবস্থাও বড় ভূমিকা রাখে। দ্রুতগতির দূরপাল্লার যানবাহনের সঙ্গে কম গতির থ্রি-হুইলার, মোটরবাইক ও ইজিবাইকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি যাত্রীর চাপ সামাল দিতে অনেক ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়কে নামানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে নগর পরিবহনের বাসও মহাসড়কে চলাচল শুরু করে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরো বাড়ায়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মো. মোসলেহ উদ্দিন হাসান বলেন, আমাদের দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় তেমন উন্নতি হয়নি। যানবাহন আধুনিক হলেও ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় আগের দুর্বলতা রয়ে গেছে, যা ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। তিনি আরো বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোতে একজন চালক নির্দিষ্ট সময় পর দায়িত্ব অন্য চালকের কাছে হস্তান্তর করেন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেন। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যয় কমানোর জন্য অনেক ক্ষেত্রে একজন চালক দিয়েই সব ট্রিপ পরিচালনা করা হয়। ঈদের সময় এই সমস্যা আরো প্রকট হয়।’
প্রফেসর মোসলেহ উদ্দিন মনে করেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘœ করতে বিভিন্ন পেশার ছুটি ভিন্ন সময়ে নির্ধারণ করা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। প্রয়োজনে পোশাক শ্রমিকদের ছুটি আরো আগে দেয়া এবং কাজে ফেরার সময় বাড়ানো হলে পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. এম শামসুল হক বলেন, ঈদ এলেই সবাই সড়কের অবস্থা নিয়ে চিন্তিত থাকেন, কিন্তু যানবাহনের ফিটনেস ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পায় না। অথচ অনেক দুর্ঘটনা ভালো সড়কেই ঘটে, যা প্রমাণ করে সমস্যা সড়কে নয়, সমস্যা যানবাহন ও ব্যবস্থাপনায়।
![]()