রাজনৈতিক ডেস্ক রিপোর্টঃ আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, কমিশনের মাঠ পর্যায়ের ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ নির্দিষ্ট একটি পক্ষকে সুবিধা দিতে পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন।
রোববার বিকেলে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।
বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, নির্বাচন কমিশনের একশ্রেণির কর্মকর্তা শুরু থেকেই পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন। আমরা তাদের সুনির্দিষ্ট তালিকা এবং কর্মকাণ্ডের বিবরণ কমিশনের কাছে জমা দিয়েছি। স্বচ্ছ নির্বাচনের স্বার্থে এসব কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান শর্ত হলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু বর্তমানে মাঠের চিত্র তার উল্টো। কমিশনকে এ বৈষম্য দূর করতে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পোস্টাল ব্যালট। মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, এবারের পোস্টাল ব্যালটে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে যা একটি বিশেষ দলকে সরাসরি সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে তাদের সন্দেহ।
বিএনপির দাবি, এ ব্যালট পেপারগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে। প্রতীক বরাদ্দের পর পোস্টাল ব্যালট দেওয়ার নিয়ম থাকলেও কমিশন অনেক ক্ষেত্রে নিয়মের তোয়াক্কা করছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিএনপি অবিলম্বে এ ত্রুটিপূর্ণ ব্যালট পেপার পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে।
বৈঠকের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচনী প্রচারণার ধরন নিয়ে আপত্তি। মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন যে, জামায়াত ও তাদের সহযোগীরা সরাসরি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে। তারা ভোটারদের এনআইডি নম্বর, বিকাশ নম্বর এবং ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করছে। এটি কেবল ভোটারদের গোপনীয়তা ভঙ্গ নয়, বরং নির্বাচনী আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন। আমরা এর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কমিশনকে বলেছি বলে জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় অভিযোগ উঠেছে ভোটার স্থানান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে। বিএনপির দাবি অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে থেকে বিপুল সংখ্যক ভোটারের এলাকা পরিবর্তন করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভোটার করা হয়েছে। এটি নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার একটি অপচেষ্টা হতে পারে বলে বিএনপি আশঙ্কা করছে।
বিএনপি মহাসচিব জানান, কারা এবং কেন এ এলাকা পরিবর্তন করেছেন, তাদের একটি স্বচ্ছ তালিকা কমিশনের কাছে দাবি করেছেন তারা।
এত অভিযোগের পরেও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা এখনো মনে করি এ কমিশনের পক্ষেই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব। তবে বর্তমান যে ত্রুটি ও বিচ্যুতির অভিযোগ আমরা করেছি, সেগুলো সমাধান করা কমিশনের নৈতিক দায়িত্ব। তারা যদি এ সমস্যাগুলো সমাধান করে, তবেই মানুষের আস্থা ফিরবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এ অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে পোস্টাল ব্যালট এবং ভোটার এলাকা পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
কমিশন যদি এ অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে না নেয়, তবে ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংকটের সৃষ্টি হতে পারে। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাগযুদ্ধ এবং অভিযোগের পাল্লা ভারী হচ্ছে। বিএনপির আজকের এ নালিশ কমিশনকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাল। এখন দেখার বিষয়, সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে কমিশন এ অভিযোগগুলোর কতটুকু সমাধান করে এবং ভোটারদের মাঝে নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।
![]()