বিশেষ ডেস্কঃ কারাবাস কিংবা আরও কঠিন পরিণতির আশঙ্কা থাকলেও আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে এবং প্রয়োজনে আত্মসমর্পণ করতেও তিনি প্রস্তুত।
গত জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টার টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময়সীমা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ডিসেম্বরের কাছাকাছি সময়ে তিনি এবং বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। দেশে ফেরার পর আদালতে হাজির হয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার কথাও বলেন তিনি।
দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার হতে পারেন—এমন আশঙ্কা সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, “তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। তারপরও আমাকে যেতে হবে।” তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মামলা, গ্রেপ্তার ও বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে রয়েছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশের বর্তমান কর্তৃপক্ষের অবস্থান ভিন্ন এবং শেখ হাসিনার বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত।
শেখ হাসিনা রয়টার্সকে আরও বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে কারাদণ্ড বা অন্য আইনি পরিণতির আশঙ্কা দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে না। অতীতেও একাধিকবার কারাবরণের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে চান। তবে কোন নির্দিষ্ট তারিখে দেশে ফিরবেন, কোন আদালতে হাজির হবেন কিংবা আত্মসমর্পণের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া কী হবে—সাক্ষাৎকারে তা জানাননি।
এরপর আগস্টে একটি অডিও সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আবারও ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বলেন। এনডিটিভির প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের মাস হওয়ায় ওই মাসেই তিনি দেশে ফিরতে চান। কারাগারে পাঠানো হতে পারে বা আরও গুরুতর পরিণতি হতে পারে—এমন সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা গুরুত্বপূর্ণ—শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দিকে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের বিস্তারিত পরিকল্পনার খবরটি মূলত রয়টার্সের টেলিফোন সাক্ষাৎকার থেকে আসে। এনডিটিভি রয়টার্সের সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। পরে পৃথক অডিও সংবাদ সম্মেলনে তিনি এনডিটিভির প্রশ্নেরও জবাব দেন এবং দেশে ফেরার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে যান। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম চলে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালের নভেম্বরে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। শেখ হাসিনা অভিযোগ ও রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধও জানিয়েছে। রয়টার্সের জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত তখন জানিয়েছিল যে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ পরীক্ষা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা অবশ্য বলেছেন, ফেরার সময় বা পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেননি এবং স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চান।
শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা নিয়ে ঢাকার প্রতিক্রিয়াও এসেছে। রয়টার্সের ১৩ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁকে কারাগারে যেতে হবে। ওই কর্মকর্তা তাঁর ফেরার ঘোষণাকে বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করার প্রচেষ্টা হিসেবেও বর্ণনা করেন।
ফলে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে তাঁর ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ কী হবে এবং দেশে ফিরলে কোন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হবে—এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়।
![]()