• সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৯ পূর্বাহ্ন

নতুন পলিসির শর্তে বীমা দাবি সমন্বয় নিষিদ্ধ করল আইডিআরএ

admin
আপডেটঃ : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

ব্যাংক-বীমা ডেস্কঃ জীবন বীমা খাতের গ্রাহকস্বার্থ সুরক্ষা, দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং বীমা কোম্পানিগুলোর অনিয়মিত চর্চা বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। এখন থেকে জীবন বীমার মেয়াদপূর্তির দাবি, মৃত্যুজনিত দাবি ও সারভাইভাল বেনিফিট পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সরকারি রাজস্ব ছাড়া অন্য কোনো অর্থ কেটে রাখা যাবে না। একই সঙ্গে পুরোনো পলিসির দাবি পরিশোধের শর্ত হিসেবে গ্রাহক বা নমিনিকে একই কোম্পানিতে নতুন বীমা পলিসি গ্রহণে বাধ্য করা এবং পুরোনো পলিসির পাওনা থেকে নতুন পলিসির প্রিমিয়াম সমন্বয় করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আইডিআরএর এ নির্দেশনার ফলে বীমা দাবি পরিশোধের নামে গ্রাহকের প্রাপ্য অর্থ আটকে রাখা, নতুন পলিসি কিনতে চাপ সৃষ্টি এবং দাবি নিষ্পত্তির অর্থ দিয়ে নতুন বীমা ব্যবসা সম্প্রসারণের মতো চর্চা বন্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি আরও জোরদার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দাবি পরিশোধে পুরো অর্থ গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে দেওয়ার নির্দেশ

আইডিআরএর জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জীবন বীমার মেয়াদপূর্তির দাবি, মৃত্যুজনিত দাবি ও সারভাইভাল বেনিফিটের বিপরীতে গ্রাহক বা মনোনীত ব্যক্তি (নমিনি) যে অর্থ পাওয়ার অধিকারী, তা সম্পূর্ণভাবে তাঁর ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করতে হবে। প্রযোজ্য সরকারি রাজস্ব ছাড়া অন্য কোনো অর্থ, ফি বা চার্জ কেটে রাখার সুযোগ নেই।

কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, বীমা দাবি নিষ্পত্তির সঙ্গে নতুন পলিসি বিক্রির শর্ত জুড়ে দেওয়া যাবে না। কোনো গ্রাহক তাঁর পুরোনো পলিসির টাকা পেতে চাইলে তাঁকে একই কোম্পানিতে নতুন পলিসি কিনতে বাধ্য করা কিংবা পুরোনো পলিসির পাওনা থেকে নতুন পলিসির প্রিমিয়াম কেটে নেওয়াও গ্রহণযোগ্য হবে না।

আইডিআরএর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, কিছু জীবন বীমা কোম্পানি দাবি পরিশোধের সময় গ্রাহক বা নমিনিকে একই প্রতিষ্ঠানে নতুন পলিসি কেনার শর্ত দিচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো পলিসির পাওনা থেকে নতুন পলিসির প্রিমিয়াম কেটে রেখে অবশিষ্ট টাকা গ্রাহককে দেওয়া হচ্ছে। এতে গ্রাহকের আর্থিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বীমা খাত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।

এ ধরনের চর্চা বন্ধ করে দাবি পরিশোধের প্রক্রিয়াকে গ্রাহকবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

৯০ দিনের মধ্যে দাবি পরিশোধে গুরুত্ব

আইডিআরএর নির্দেশনায় বীমা দাবি পরিশোধের নির্ধারিত সময়সীমার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসারে মেয়াদপূর্তির দাবি নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নতুন পলিসি কেনার কোনো শর্ত আরোপ করা যাবে না এবং নতুন পলিসির প্রিমিয়াম বাবদ দাবি থেকে অর্থ সমন্বয় করা যাবে না।

তবে নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ দাবি পরিশোধ করা হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের নামে একই কোম্পানি নতুন পলিসি ইস্যু করতে পারবে। অর্থাৎ, নিয়ম মেনে সময়মতো দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে নতুন পলিসি ইস্যুতে এই নির্দেশনায় কোনো অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি।

অন্যদিকে, নির্ধারিত ৯০ দিনের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ৯১ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে দাবি পরিশোধ করা হলে, চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধের তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ দিন সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের নামে নতুন পলিসি ইস্যু করতে পারবে না ওই বীমা কোম্পানি।

আর মেয়াদপূর্তির দাবি ১২০ দিন বা তারও পরে পরিশোধ করা হলে, চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধের তারিখ থেকে পরবর্তী ১৮০ দিন সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের নামে নতুন পলিসি ইস্যু করা যাবে না।

এ নির্দেশনার মাধ্যমে দাবি পরিশোধে বিলম্বের সঙ্গে নতুন পলিসি ইস্যুর ওপর নির্দিষ্ট সময়ের নিষেধাজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সময়মতো দাবি নিষ্পত্তির বিষয়ে কোম্পানিগুলোর ওপর বাড়তি দায়বদ্ধতা তৈরি হবে।

আইডিআরএর উদ্যোগকে মাইলফলক বলছেন নাসির উদ্দিন আহমেদ পাভেল

আইডিআরএর এ নির্দেশনাকে জীবন বীমা খাতের জন্য মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ভাইস চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সাবেক সভাপতি নাসির উদ্দিন আহমেদ (পাভেল)।

তিনি বলেন, বীমা দাবির অর্থ সমন্বয় করে নতুন পলিসি ইস্যু করার প্রচলনের কারণে অতীতে অনেক পলিসি তামাদি হয়ে যেত। গ্রাহকেরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা খাত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল।

আইডিআরএর নতুন নির্দেশনার ফলে এসব সমস্যা সমাধানের পথ তৈরি হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ উদ্যোগ জীবন বীমা খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।

গ্রাহকস্বার্থ সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা

জীবন বীমা মূলত মানুষের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা, সঞ্চয় এবং পরিবারের ঝুঁকি মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও গ্রাহককে তাঁর প্রাপ্য অর্থ পেতে যদি নতুন পলিসি কিনতে বাধ্য হতে হয়, তাহলে বীমার মূল উদ্দেশ্যই বাধাগ্রস্ত হয়। একইভাবে মৃত্যুজনিত দাবির অর্থ পেতে নমিনিকে অযৌক্তিক শর্তের মুখোমুখি করা হলে তা গ্রাহকসেবার মান ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এ বাস্তবতায় আইডিআরএর নির্দেশনা শুধু অর্থ কেটে রাখা বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দাবি নিষ্পত্তি ও নতুন পলিসি বিক্রির মধ্যকার স্বার্থের সংঘাত কমানোর ক্ষেত্রেও তা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, গ্রাহকের প্রাপ্য দাবি পরিশোধ করা বীমা কোম্পানির দায়িত্ব, আর নতুন পলিসি কেনা সম্পূর্ণ আলাদা একটি সিদ্ধান্ত। এই দুই বিষয়কে পৃথক রাখার মাধ্যমে গ্রাহকের স্বাধীনতা ও আর্থিক অধিকার সুরক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে নির্দেশনার সুফল পুরোপুরি নিশ্চিত করতে এর বাস্তবায়ন, কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি গুরুত্বপূর্ণ হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দেশনা অমান্য করে দাবি থেকে অর্থ কেটে রাখলে কিংবা নতুন পলিসি কিনতে চাপ সৃষ্টি করলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের অভিযোগ গ্রহণ ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে দাবি নিষ্পত্তির সময়সীমা, অর্থ পরিশোধের প্রমাণ এবং গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে সম্পূর্ণ অর্থ স্থানান্তরের বিষয়গুলো যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা গেলে জীবন বীমা খাতে জবাবদিহি আরও বাড়বে।

আস্থার সংকট কাটাতে কার্যকর হতে পারে নতুন নির্দেশনা

বাংলাদেশের জীবন বীমা খাতে গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। পলিসি গ্রহণের সময় গ্রাহকের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও দাবি পরিশোধের সময় জটিলতা, বিলম্ব কিংবা অযাচিত শর্তের মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ খাতটির ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করে।

এ অবস্থায় আইডিআরএর নতুন নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে গ্রাহকের প্রাপ্য অর্থ সুরক্ষিত রাখা, দাবি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব কমানো এবং বীমা কোম্পানির প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে নির্দেশনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, কোম্পানিগুলোর নিয়ম মেনে চলা এবং গ্রাহকস্বার্থবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপের ওপর। একই সঙ্গে বীমা কোম্পানিগুলোকে নতুন পলিসি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বিদ্যমান গ্রাহকদের ন্যায্য পাওনা সময়মতো পরিশোধ এবং মানসম্মত সেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সব মিলিয়ে, দাবি পরিশোধের অর্থ থেকে নতুন পলিসির প্রিমিয়াম সমন্বয় বন্ধ এবং বিলম্বিত দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে নতুন পলিসি ইস্যুতে সময়সীমাভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে আইডিআরএ জীবন বীমা খাতে গ্রাহকস্বার্থ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। এখন এ নির্দেশনার কার্যকর প্রয়োগই হবে গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দেশের জীবন বীমা খাতকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব করে তোলার প্রধান শর্ত।

Loading


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ