ইসলাম ডেস্ক রিপোর্টঃ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিষণ্নতা একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ব্যাপক রোগ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় অনেক মুসলিম একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলেন: মানসিক রোগ মোকাবিলায় ইসলাম কী বলে?
ইসলাম ও মানসিক স্বাস্থ্য
কোরআন মানসিক প্রপঞ্চগুলো যেমন- প্রশান্তি, উদ্বেগ, ভয় ও দুঃখের মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত গভীরভাবে আলোচনা করেছে, যা আধুনিক মনোবিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে বহু পরে। মিসরের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ড. আবদুল হালিম মাহমুদের মতে, ইসলাম কেবল উপসর্গ নয়, রোগের মূল চিকিৎসা করে, কারণ এটি মানুষের সঙ্গে তার রবের, নিজের এবং অন্যদের সম্পর্ক পুনর্গঠন করে; যা তাকে যে কোনো মানসিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে।
জিকির ও প্রশান্তি
উদ্বেগে আক্রান্তদের জন্য ইসলামের সবচেয়ে উজ্জ্বল উপহার হলো কোরআনের এই আয়াত: ‘জেনে রাখো, আল্লাহর জিকিরেই হৃদয় প্রশান্ত হয়।’ (সুরা আর-রাদ ১৩: ২৮) আল্লাহর স্মরণে প্রাপ্ত প্রশান্তি কেবল ক্ষণিক অনুভূতি নয়, বরং এটি স্নায়ুতন্ত্রের প্রকৃত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করে। আধুনিক গবেষণাও প্রমাণ করেছে যে, নামাজ ও জিকির রক্তে কর্টিসল অর্থাৎ স্ট্রেস হরমোন হ্রাস করে।
মানসিক রোগ: পাপ নয়, অসুস্থতা
সমসাময়িক আলেমদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো এই ভ্রান্ত ধারণা সংশোধন করা যে, মানসিক রোগ দুর্বল ঈমান বা পাপের প্রমাণ। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, মানসিক রোগ অন্য যেকোনো অসুস্থতার মতোই একটি রোগ। মুমিনের মানসিক রোগ কখনও আল্লাহর সঙ্গে তার দূরত্বের আলামত হতে পারে না। আমরা দেখতে পেয়েছি যে, ইউনুস, আইয়ুব, ইবরাহিম (আ.) এর মতো নবীরা গুরুতর মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়েছিলেন, অথচ তারা ছিলেন আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা। তাই সমাজে যদি মানসিক অশান্তি ব্যাপক আকারে দেখা দেয় তাহলে নবীর ওয়ারিশ হিসেবে এই সমস্যার মোকাবিলা করা আলেমদের কাঁধে পড়ে সবার আগে। জনগণেরও উচিত হবে কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়া তাদের কাছে আধ্যাত্মিক নির্দেশনা অর্জন করা।
ধৈর্য ও সন্তুষ্টি
ইসলামে ধৈর্য কোনো নিষ্ক্রিয় আত্মসমর্পণ নয়, বরং এটি এক ইতিবাচক প্রতিরোধ; যার কল্যাণে সে জীবনের যে বাধা বিপত্তি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে। কোরআন নব্বইয়েরও বেশি স্থানে ধৈর্যকে সুসংবাদ ও আল্লাহর সাহচর্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আধুনিক ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে যে, মানসিক স্থিতিশীলতা বা ‘Psychological Resilience’ মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান; যা ইসলাম শতাব্দী আগেই ধৈর্যের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে।
মনোচিকিৎসা: বৈধ ও প্রয়োজনীয়
সমাজের কেউ এই সমস্যায় আক্রান্ত হলে প্রয়োজনে তাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে এবং এই জন্য ওষুধ সেবনে করাটাকেও দীনি দায়িত্ব মনে করতে হবে। নবীজির (সা.) একটি হাদিস এরকম: ‘চিকিৎসা গ্রহণ করো, কারণ আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার নিরাময় সৃষ্টি করেননি।’- (সুনান আবু দাউদ এবং তিরমিজি) মানসিক ওষুধের সঙ্গে জিকির, নামাজ ও দোয়ার সমন্বয়ই হলো সর্বোত্তম পদ্ধতি।
সামাজিক সমর্থন: সামষ্টিক দায়িত্ব
নবীজি (সা.) বিষণ্ন ও শোকাহতদের পাশে থেকে, সদয় কথা বলে এবং দোয়ার মাধ্যমে সহায়তা করতেন, যাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ‘Social Support’ বলে। যে মুসলিম সমাজ তার মানসিক রোগীকে পরিত্যাগ করে বা দোষারোপ করে, সে নবীজির সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত হয়। হাদিসে এসেছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কষ্টগ্রস্ত, শোকাহত ও বিপদাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতেন, তাদের সান্ত্বনা দিতেন এবং তাদের জন্য দোয়া করতেন। তিনি মুমিনদের একটি দেহের মতো পরস্পরের দুঃখে-সুখে অংশগ্রহণ করতে শিক্ষা দিয়েছেন (সহিহ বোখারি এবং মুসলিম)। তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিনের তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’(সহিহ মুসলিম) তাই মানসিক কষ্টে আক্রান্ত মানুষকে অবহেলা করা, একঘরে করা বা দোষারোপ করা ইসলামের সহমর্মিতা ও দয়ার শিক্ষার পরিপন্থি।
তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিনের তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’(সহিহ মুসলিম)
ইসলাম কখনও মানসিক যন্ত্রণাকে অস্বীকার করে না বরং এটি মানুষের মানবতাকে গভীরতম রূপে স্বীকার করে। আল্লাহর জিকির, নামাজ, ধৈর্য, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা এবং সামাজিক সহায়তার সমন্বয়ই মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার সবচেয়ে পরিপূর্ণ পদ্ধতি। সূত্র, জাতীয় অর্থনীতি
শাহেদ হারুন
ইসলামি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
![]()